আজকের বিষয় ঐতিহ্যে স্বর্ণ

আজকের দিনে “ঐতিহ্য স্বর্ণ” বলতে বোঝানো হতে পারে ঐতিহ্যবাহী ডিজাইন বা নকশার স্বর্ণ (যেমন, বাংলাদেশে তৈরি গয়না, যা বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়) অথবা একটি হেরিটেজ গোল্ড ব্র্যান্ড দ্বারা তৈরি উচ্চমানের সেলাই করা পোশাক, যার মধ্যে শত বছরের বেশি কারিগরি অভিজ্ঞতা ও কালজয়ী শৈলী বিদ্যমান। আপনার প্রশ্নটি নির্দিষ্ট না হওয়ায়, “ঐতিহ্য স্বর্ণ” এই দুটি ভিন্ন অর্থই প্রকাশ করতে পারে। 

স্বর্ণ অথবা সোনা অতি প্রচীন মুল্যবান একটি মৌল ধাতু। বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এই ধাতুর সাথে পরিচিত। অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য, চকচকে বর্ণ, বিনিময়ের সহজ মাধ্যম, কাঠামোর স্থায়ীত্বের কারণে এটি অতি মূল্যবান ধাতু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। প্রাচীন গ্রীসে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম-সপ্তম শতাব্দীতে সোনার মুদ্রা প্রচলিত ছিল। এছাড়াও, চীন, ভারত, এবং আর্মেনিয়াতেও প্রাচীনকালে সোনার ব্যবহার দেখা যায়। সোনা বহুবিধ কারণে ব্যবহৃত হয়, যেমন অলঙ্কার তৈরি, দেবদেবীর মুর্তি, মুদ্রা ও বার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, চিকিৎসা ক্ষেত্রে, এবং কিছু শিল্প প্রক্রিয়ায়। এটি একটি মূল্যবান ধাতু যা সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশে সোনার ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ এবং প্রাচীন।

স্বর্ণ এদেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি অলঙ্কার, সম্পদ এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সোনার ব্যবহার এদেশের লোককলা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং অলংকারেও প্রতিফলিত হয়। অলংকার মানুষের সাজসজ্জার মাধ্যম যা মানুষের দৈহিক সৌকর্য বৃদ্ধি করে। পৃথিবীর প্রায় সকল জাতি অলংকার ব্যবহার করে। জাতি ও সংস্কৃতি ভেদে অলংকারের গড়ন ও প্রকৃতি বিভিন্ন হয়ে থাকে। আধুনিক সভ্যতায় সোনা ও রূপার অলংকার সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। সোনা বাংলাদেশে অলঙ্কার তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

বিয়ে, জন্মদিন, বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে সোনার গহনা উপহার দেওয়া বা পরা একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা। সোনার চেইন, হার কানের দুল, আংটি, চুড়ি, বালা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের গহনা বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। সাক্ষৎকার : রাকেশ চন্দ্র বিশ^াস সোনার গহনা তৈরির প্রক্রিয়া বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমের চাহিদা অনুযায়ী গহনার নকশা করা হয় এরপর পরিশোধিত সোনা ব্যবাহার করে ঢালাই করা হয়। এরপর, গহনা পরিষ্কার করা হয় এবং পালিশ করা হয়।

এছাড়াও, গহনায় পাথর বসানো এবং চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা করার বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অভিজ্ঞ কারিগরের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। যারা সোনা দিয়ে গহণা বানায় তাদের বলা হয় স্বর্ণকার। বাংলাদেশে প্রতিটি অঞ্চলেই অনেক মানুষ আদি এই পেশার সাথে জরিত। কেউ কেউ বংশপরম্পরায় এ পেশাকে বেঁছে নিয়েছেন। স্বর্ণকার পেশাটি আদি ও অভিজাত একটি পেশা। বর্তমানে স্বর্ণ থেকে গহনা তৈরীর মেশিন তাকলেও সারা বাংলাদেশে তা অপ্রতুল। এদেশের স্বর্ণকারেরা এখনও গহণা প্রস্তুতে পুরোনো আদি পদ্ধতিই ব্যবহার করছেন। ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার একজন স্বর্ণকার পঙ্কজ ধর বিগত ৩০ বছর যাবত এই পেশায় আছেন। তিনি জানালেন সময়ের সাথে সাথে অনেক পরিবর্তন এসেছে এই ব্যবসায়। সাক্ষাৎকার : পঙ্কজ ধর লোকশিল্প টিকে আছে মূলত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সমাজ এবং সময়ের যে পরিবর্তন এই পরিবর্তনের সাথে সাথে লোকশিল্পীরাও তাদের যে শিকড় তাকে আঁকড়ে ধরে রেখে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নিজেদের নবায়ন করছে।

স্বর্ণের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। বর্তমান আধুনিক সময়ে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডিজাইনের গহনা প্রস্তুতে ব্যবহার হচ্ছে মেশিন। তাই নতুন কারিগর তৈরীতে স্বর্ণকারেরা এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তাছাড়া নিখুত ভাবে গহণা তৈরীতে যে শ্রম দিতে হয় তা তাদের শরীরে প্রভাব ফেলে। তাই নতুনর এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তারপরও পৃথিবী যতদিন আছে ততদিন স্বর্ণের তৈরী অলংকারের ব্যবহার থাকবে। সেই সাথে সোনা বা স্বর্ণের ঐতিয্যের ধারা অব্যাহত থাকবে।

Facebook
WhatsApp
X
Telegram

মন্তব্য করুন