বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক এক বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লক্ষ একুশ হাজার সাতশ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়—বরং দেশের রপ্তানি খাতের জন্য এক বিশাল বিপর্যয়।
আগুন লাগার পর মুহূর্তেই কার্গো ভিলেজের বেশ কয়েকটি গুদামঘর ভস্মীভূত হয়ে যায়। সেখানে ছিল বিপুল পরিমাণ রপ্তানিযোগ্য পোশাক, ওষুধ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং আমদানির কাঁচামাল। দমকল বাহিনীর ১৫টিরও বেশি ইউনিট কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে সবকিছু ছাই হয়ে গেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট বা কোনো দাহ্য পদার্থের বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিশাল ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়বদ্ধতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর:
প্রথমত, কার্গো ভিলেজ ও গুদামগুলোর বীমা কাভারেজ কতটা ছিল।
দ্বিতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার যথাযথতা।
এবং তৃতীয়ত, সরকারি পর্যায়ের দায়বদ্ধতা ও সহায়তা পরিকল্পনা।
বাণিজ্য বিশ্লেষক প্রজ্ঞা সংবাদকে বলেন, “এটি শুধুমাত্র সরাসরি আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন, কারণ সময়মতো পণ্য সরবরাহ সম্ভব হবে না।”
রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি জানান, কার্গো ভিলেজে রাখা তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালের বিপুল অংশ পুড়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য বীমা না করায় পুরো ক্ষতি তাদের নিজেদের কাঁধে পড়েছে। যেসব পণ্য বীমাকৃত ছিল, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বীমা কোম্পানিগুলোকে। তবে প্রক্রিয়াটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি পর্যায় থেকে ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিষয়ও বিবেচনায় আছে। একই সঙ্গে কার্গো নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বব্যাপী চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানিকারক। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, বীমা দাবির নিষ্পত্তি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।
“অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়া এখন মিলিয়ে গেলেও, ব্যবসা-বাণিজ্যে এর কালো ছায়া কাটতে সময় লাগবে অনেক।”