উচ্চফলনশীল একাঙ্গী চাষে সম্ভাবনা ও উৎপাদন প্রযুক্তি

একাঙ্গী পরিচিতি

একাঙ্গী (Kaempferia galanga L.) জিনজিবারেসি (Zingiberaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি হার্ব জাতীয় উদ্ভিদ। একে অনেক সময় বাংলায় ভুঁই চম্পা বা সুরভি আদা বলা হয়। তবে বাংলাদেশে এটি একাঙ্গী/একানী নামে বেশি পরিচিত। এর উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ চীন অথবা ভারত বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে এর চাষ করা হয়।

এর পাতা পুরু, গোলাকৃতি এবং মাটির সঙ্গে লাগানো অবস্থায় থাকে। নতুন পাতা ক্ষুদ্র রাইজোম থেকে বের হয়। গ্রীষ্মকালে ১-২টি সাদা রঙের ফুল ফোটে। শীতকালে পাতা মরে গিয়ে রাইজোম সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

যেসব এলাকায় আদা ও হলুদ চাষ হয় সেসব এলাকায় একাঙ্গী চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা ও ঝিনাইদহ ইত্যাদি এলাকাতে একাঙ্গীর চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াতেও এর চাষ হয়।

একাঙ্গী মসলা ফসল ও মাছের চার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এতে থাকা এসেনসিয়াল অয়েল বিভিন্ন কারি তৈরিতে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পারফিউম ও কসমেটিক শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। একাঙ্গী রক্ত পরিষ্কারক, পাকস্থলীর ঘা সারাতে ও ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিরাময়ে কার্যকর।


বারি একাঙ্গী-১ জাত

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা একাঙ্গীর বেশ কয়েকটি লাইনের ওপর গবেষণা চালিয়ে ২০১৭ সালে বারি একাঙ্গী-১ নামের একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করে।

জাতের বৈশিষ্ট্য:

  • বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ
  • গাছের উচ্চতা: ১০-১৫ সেমি
  • পাতা: দৈর্ঘ্য ১২-১৫ সেমি, প্রস্থ ১০-১২ সেমি
  • রাইজোমের দৈর্ঘ্য: ৫.৫-৬.৫ সেমি
  • প্রতিটি রাইজোমে ফিঙ্গারের সংখ্যা: ৬-৮টি
  • রোগ ও পোকা সহনশীল
  • ফলন: প্রতি হেক্টরে ১২-১৫ টন

উৎপাদন প্রযুক্তি

মাটি ও জলবায়ু

  • পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ দো-আঁশ মাটি উপযোগী
  • উপযুক্ত pH: ৬-৬.৫
  • বার্ষিক বৃষ্টিপাত: ২৫০০-৩০০০ মিমি
  • তাপমাত্রা: ৩০-৩৫° সেলসিয়াস
  • হালকা ছায়াযুক্ত পরিবেশে ভালো জন্মে

বীজ শোধন

১০০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫/অটোস্টিন মিশিয়ে রাইজোম ৩০-৪৫ মিনিট ভিজিয়ে শোধন করতে হবে।

মাটি শোধন

গভীর চাষে জমি উল্টে রোদে রেখে বা ফুরাডান/নিম কেক প্রয়োগে মাটি জীবাণুমুক্ত করা যায়।

রোপণ সময়

এপ্রিলের ১ম সপ্তাহ থেকে মে মাসের ২য় সপ্তাহ।

বীজের হার ও আকার

  • বীজ ওজন: প্রতি রাইজোম ২০-২৫ গ্রাম
  • প্রতি হেক্টরে বীজের পরিমাণ: ১২০০-১৪০০ কেজি

রোপণ দূরত্ব

  • সারি দূরত্ব: ৪০-৫০ সেমি
  • গাছ দূরত্ব: ২০-২৫ সেমি

সার প্রয়োগ

জৈব সার + ইউরিয়া + টিএসপি + জিপসাম + জিংক + এমওপি
(পরিমাণ পূর্বের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুসরণযোগ্য)

সেচ ও আগাছা পরিচর্যা

  • প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ
  • জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে

আন্তঃফসল

একাঙ্গীর সঙ্গে মরিচ, পেঁয়াজ, লালশাক, শিম, লাউ ইত্যাদি ফসল চাষ করা যায়।


ফল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

  • রোপণের ৯-১০ মাস পরে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) সংগ্রহ উপযোগী
  • পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে গেলে তোলার সময়
  • বীজ একাঙ্গী সংরক্ষণে মাটির গর্তে খড় দিয়ে ঢেকে রাখা উত্তম

রোগবালাই ও প্রতিকার

রাইজোম রট / কন্দ পচা

লক্ষণ: রাইজোমে পানি ভেজা দাগ, দুর্গন্ধ, শিকড় পচা, গাছ ঢলে পড়া।

প্রতিকার:

  • আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুঁতে/পুড়িয়ে ফেলতে হবে
  • বীজ শোধন বাধ্যতামূলক
  • পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত
  • রিডোমিল গোল্ড/সিকিউয়ার স্প্রে (১০-১২ দিন অন্তর)

পোকার দমন

  • মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা ক্ষতি করে
  • আক্রান্ত পাতা/কা- নষ্ট করতে হবে
  • রিপকর্ড/ক্যারাটে (১ মি.লি./লিটার) স্প্রে
  • ফুরাডান দানাদার সার মাটিতে প্রয়োগ

ফলন

  • প্রতি হেক্টর ফলন: ১২-১৫ টন😊
Facebook
WhatsApp
X
Telegram

মন্তব্য করুন