সবুজ শস্য-শ্যামল প্রান্তর, রাশিরাশি বৃক্ষরাজি আর দূর দিগন্তে দৃষ্টির সীমানায় আকাশের নীলিমার সখ্যতা নিয়ে গাজীখালি, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা বন্দর মানিকগঞ্জ। এ জেলার নৈসর্গিক দৃশ্যে মন হারিয়ে যায় প্রকৃতির সাথে। ধলেশ্বরীর রূপালী বেলাভূমিতে ভোরের আকাশের উদীয়মান সূর্যের শাশ্বত রূপ হয় মোহনীয়। এমন অপরূপ রূপের জেলা মানিকগঞ্জ। মানিকগঞ্জ জেলার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে বালিয়াটি প্রাসাদ, তেওতা জমিদার বাড়ী, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র, স্বপ্নপুরী, ফলসাটিয়া খামার বাড়ী, ক্ষণিকা, শহীদ রফিক স্মৃতি যাদুঘর, নাহার গার্ডেন বেশ জনপ্রিয়।
মানুষের জীবন, সমাজ, ধর্ম, বিশ্বাস আর কাল প্রবাহের গভীরে প্রোথিত শিকড় থেকেই সংস্কৃতির জন্ম এবং বিকাশ। মানিকগঞ্জের সংস্কৃতি ও এর বিকাশও এ সত্যের বাইরে নয়, একই সূত্রে গাঁথা।

"বাঙালীর সংস্কৃতির বৃহত্তম অংশের বিকাশ ধর্মকেই আশ্রয় করে। ধর্ম ভিত্তিক সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলা ছেড়ে দিয়ে দৈনন্দিন জীবনের নিত্য নৈমিত্তিকতার আচরণবিধির মধ্যেও বাঙালীর ধর্মীয় মানসিকতার প্রাধান্য ঘটেছে।.... হাতে শাখা, সিথিতে সিঁদুর, চোখে সুরমা, হাতে মেহেদী জারি, সারি, মুর্শিদী, মর্সিয়া, গজল, বাউল, কীর্তন ....সর্বত্রই ধর্মের চিহ্ন, অধর্ম কোথাও নেই " (বাংলার লোক সংস্কৃতি, ড. ওয়াকিল আহমেদ)।
মানিকগঞ্জের সংস্কৃতি মুলতঃ বাঙালী সংস্কৃতি। তাই এখানে ধর্মীয় প্রভাব স্বাভাবিক কারনেই গভীর। এ সংস্কৃতির প্রতিটি গাঁথুনীতেই ধর্মের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মাচারে বৈষ্ণব এবং সুফী দর্শণের প্রাবল্য এ অঞ্চলের মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মানুষের মধ্যে গড়ে উঠে সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। ধর্মীয় বিরোধ এখানে কখনই বড় হয়ে উঠেনি। অসাম্প্রদায়িক এ চেতনা নিয়েই মানিকগঞ্জের হিন্দু ও মুসলমান হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে।


ওন্নি গানঃ
মানিকগঞ্জের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওগ্নি গান নামে এক ধরনের মাঙ্গন গীতি প্রচলিত আছে। ফসল কাটার পর রাখাল বালকেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওন্নি গান গেয়ে শিরনীর উপকরণ সংগ্রহ করে থাকে। বীছাতঃ মানিকগঞ্জের কৃষক পরিবারে বীছাতের প্রচলন ছিল দীর্ঘ দিনের। বীছাত নামের এ অনুষ্ঠানটি পালন করা হত বীজ বপনের পূর্বে। আতপ চাল, দুধ দিয়ে তৈরী ক্ষীর এবং কলা দিয়ে বাড়ির রাখাল/ ক্ষেত মজুরদের আপ্যায়ন করা হত। সরিষার তেল ও সিঁদুর মাখানো হত বাড়ির গরুর শিং-এ।

লোক সংগীত, কীর্তনঃ
মানিকগঞ্জ জেলা অর্থনৈতিকভাবে কখনই সমৃদ্ধ ছিল না। তাই বলে অভাবের তান্ডবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন কখনো বিপন্নও হয়নি। ফলে কৃষি নির্ভর মানিকগঞ্জের মানুষের মনে কঠিন জীবন বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলো আধ্যাত্মিকতা। জনমানুষের আধ্যাত্ম চেতনায় সমৃদ্ধ হয়েছে মানিকগঞ্জের লোক সংগীত। জারি গান, সারি গান, বিচার গান, কবি গান, বাউল গান, মুর্শিদী, মারফতী, গাজীর গান, গাজনের গান, বেহুলার গান, ধুয়া গান, বারোমাসী গীত, মেহেদী তোলার গীত, বিয়ের গীত, ঘেটু গান, মর্সিয়া, পাঁচালী, ওগ্নি গান, ব্যাঙ বিয়ের গান ইত্যাদি মানিকগঞ্জের গ্রামীন জীবনের প্রতি পরতে পরতে মিশে আছে আজো। দুই থেকে তিন যুগ আগেও মানিকগঞ্জের গ্রামীন জনপদের বাড়ির আঙিনা, মাঠ আর বটের ছায়ায় বসতো লোকজ মেলা।
যাত্রা-পালাগানঃ
যাত্রা ও পালাগানের প্রতি মানিকগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা সহজাত। শত শত বছর ধরে গ্রামীণ জনপদ মাতিয়েছে যাত্রা এবং পালাগান। গনেশ অপেরা, চারণিক, বলাকা অপেরা, বঙ্গ দীপালী অপেরা, রাজলক্ষী অপেরা, নবপ্রভাত অপেরা, সত্য নারায়ন অপেরা, প্রগতি অপেরা, চারিগ্রাম যাত্রাদলসহ দেশখ্যাত অনেক যাত্রাদলের জন্ম মানিকগঞ্জে।
লোক শিল্পঃ
লোক শিল্পীরা প্রধানত শ্রমজীবী মানুষ। গ্রামীন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা লোক শিল্পের উপাদান। ব্যক্তিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা লোক শিল্পে গভীরভাবে প্রবিষ্ট এবং ব্যাপ্ত। মানিকগঞ্জেও এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি। বাঁশ বেতের শিল্পকর্ম, খেজুর পাতার নকশাদার পাটি, কুলা, কাঠের কাজ, পাটের শিকা, নকশী কাঁথা, নকশা করা হাড়ি, সরার কদর সুবিদিত। মানিকগঞ্জের নারীদের সুতার কাজের কদর এখনও তুঙ্গে। রাজধানী ঢাকার অভিজাত হ্যান্ডিক্রাফটের দোকানের সেরা পাঞ্জাবীর সুই সুতোর সেরা নকশা মানিকগঞ্জের নারীদের হাতেই হচ্ছে।
পিঠাপুলিঃ
কৃষি ভিত্তিক জীবন এবং অভাবের বাড়াবাড়ি না থাকায় পিঠা তৈরী এবং আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রন করে তা খাওয়ানোর সংস্কৃতি মানিকগঞ্জে খুব জনপ্রিয়। পিঠা তৈরীর চাল, খেজুরের গুড় এবং নারকেলের দুধ এক সময় মানিকগঞ্জে সহজলভ্য ছিল বিধায় এ অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের বাহারী পিঠা তৈরীর রেওয়াজ এবং আনন্দ বিদ্যমান ছিল। মানিকগঞ্জের মত পিঠার বৈচিত্র্য দেশের খুব কম জেলাতেই খুজঁ পাওয়া যায়। মানিকগঞ্জের নারীদের কুলি পিঠা, নারকেল খেজুরের গুড়-চালের ভাপা পিঠা, ছিট রুটি, দুধভেজানো পিঠা, দুধকুলি, মাংস কুলি, চিতই পিঠা, তেল চিতই, তালের পিঠা, পাটিসাপ্টা, হাতেকাটা সেমাই পিঠার মত পিঠা তৈরীতে পারঙ্গমতা দেখবার মত।
নৌকা বাইচঃ
খাল, বিল, নদীর জেলা মানিকগঞ্জ। এ জেলার মানুষের সার্বজনীন বিনোদন এবং উৎসবের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল নৌকাবাইচ। সদরের কালীগংগা, সিংগাইরের ধলেশ্বরী, ঘিওরের হেলাচিয়া এবং খোদ জেলা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে বিভিন্ন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হত নৌকাবাইচ। এসব বাইচকে কেন্দ্র করে ধনী- দরিদ্র, জমিদার-প্রজা, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে লাখো মানুষের মধ্যে বয়ে যেত উৎসবের সার্বজনীন আনন্দধারা।
খেলাধূলাঃ
খেলাধুলার ক্ষেত্রে মানিকগঞ্জের নিজস্ব বৃত্ত আছে। প্রাচীনকাল থেকে মানিকগঞ্জের গ্রামীন জনপদ মাতিয়ে রেখেছে দারিয়া বাঁধা, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, বউ ছি, হা-ডু-ডু, সাঁতার, কড়ি খেলা, বাঘবন্দি, ষোলগুটি,লুডু, কাঁনামাছি এবং ফুটবলের মত অসংখ্য খেলা।


https://www.youtube.com/watch?v=SStcblnKq_0