বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন শিল্পকারখানার শ্রমিক ও ফ্লোটিং ভোটাররা। জেলার ছোট-বড় প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানায় কর্মরত লাখো শ্রমিক দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে এখন গাজীপুরের স্থায়ী ভোটারে পরিণত হয়েছেন।
গাজীপুর-১, গাজীপুর-২ ও গাজীপুর-৩ এই তিনটি সংসদীয় আসনজুড়ে গড়ে ওঠা পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, ইলেকট্রনিকসসহ নানা শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা এখন একটি বড় ভোটব্যাংক। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই এই শ্রমিক ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হন।
জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৮ জন, নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩৪ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৯৩৫টি এবং ভোটকক্ষ ৫ হাজার ১৭৩টি। এবারের নির্বাচনে মাঠে রয়েছেন ৪২ জন প্রার্থী।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন শুধু কর্মজীবী জনগোষ্ঠী নন, বরং স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করে গাজীপুরের ভোটার হয়েছেন। ফলে ভোটার তালিকায় শ্রমিকদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কোনাবাড়ীর একটি গার্মেন্টসে কর্মরত মো. সালেহিন বলেন, “এখানেই কাজ করি, পরিবারও এখানে। তাই এখানকার ভোটার হয়েছি। আমরা ভেবেচিন্তেই ভোট দেব।”
অন্যদিকে কালিয়াকৈরের ইমন খান জানান, ছুটির কারণে তিনি ভোটের সময় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যা ভাসমান ভোটারদের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলছে।
শ্রমিক ভোটারদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থীরা সরাসরি কারখানায় গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসা সুবিধার মতো বিষয়গুলোকে নির্বাচনি অঙ্গীকারে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে, অতীতের নির্বাচনে গাজীপুরের আসনগুলোতে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। ফলে সংগঠিত ও সংখ্যায় বড় শ্রমিক ভোটাররা ফলাফল বদলে দিতে সক্ষম।
এছাড়া মহানগরীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ভাসমান। এদের অনেকেই শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটাররাও প্রার্থীভিত্তিক ভোট দেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
চৌরাস্তার ভোটার তাহের উদ্দিন বলেন, “ভোট দেব ঠিকই, তবে কাকে দেব এখনো ঠিক করিনি। শেষ দিনে সিদ্ধান্ত নেব।”
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের নেতা মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, “গাজীপুরের শ্রমিকরাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে।”
সমাজকর্মী দোলন ইসলাম বলেন, “ফ্লোটিং ভোটাররা যেদিকে যাবে, সেই দিকেই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।”
সুজনের গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির জানান, বিশাল ভোটব্যাংক, ফলাফল পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং তরুণ ও নারী ভোটার—এই তিন কারণে শ্রমিক ভোটাররাই এখন গাজীপুরে জয়ের মূল চাবিকাঠি।