নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই জুলাই সনদ লঙ্ঘন করেছেন—এমন অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৃহস্পতিবার বিকালে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন,
“প্রধান উপদেষ্টা ভাষণের মাধ্যমে নিজের সই করা জুলাই সনদ লঙ্ঘন করেছেন। কারণ জাতীয় সনদে তিনি স্বাক্ষর করেছেন এবং এ ভাষণের মাধ্যমে তা তিনি লঙ্ঘন করেছেন। আপাতত এটুকুই আমার প্রতিক্রিয়া।”
যদিও সালাহউদ্দিন আহমেদ কীভাবে সনদ লঙ্ঘন হয়েছে তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন—দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সন্ধ্যায় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর জানানো হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। ওই ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজন করা হবে—সম্ভবত আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে।
তিনি বলেন,
“এতে কোনোভাবেই সংস্কারের লক্ষ্য ব্যাহত হবে না। বরং নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে।”
ভাষণে ড. ইউনূস জানান, জুলাই সনদের আলোকে ইতোমধ্যেই গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপিত প্রশ্ন নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্নটি হবে—
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
এর সঙ্গে চারটি মূল প্রস্তাব সংযুক্ত থাকবে—
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের নতুন কাঠামো,
২. দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন,
৩. নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও কমিটির সভাপতির নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ,
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন।
ভাষণের পর বিএনপি অভিযোগ করে বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা নেই, তিনি কেবল অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
দলের নেতারা দাবি করছেন, রাষ্ট্রপতির বৃহস্পতিবারের “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ” সংবিধানবিরোধী হতে পারে।
বিএনপি মনে করে, প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি উভয়েই জুলাই সনদের কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে, “ড. ইউনূস যেভাবে গণভোটের দিন ও কাঠামো ঘোষণা করেছেন, তা জুলাই সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, গত নয় মাসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তিনি এটিকে ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য “আশাব্যঞ্জক উন্নয়ন” বলে মন্তব্য করেন।
কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন,
“জুলাই সনদ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে সংস্কার, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের নতুন ভিত্তি তৈরি করবে।”
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে সন্ধ্যা ৭টায়।
দলের একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য, গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ—সবকিছু নিয়ে আলোচনা হবে।
বৈঠক শেষে বিএনপি দলীয় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।
একদিকে ড. ইউনূস সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে বিএনপি বলছে—সংবিধান ও জুলাই সনদের চুক্তি লঙ্ঘন হচ্ছে।
ফলে, নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক গণভোটের বৈধতা, নির্বাচনকালীন প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সূত্র: প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ, বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া, দলীয় সূত্র
সম্পাদনা: প্রজ্ঞা সংবাদ