হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ শিল্প

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রবহমান নদীর মতো। জাতি, কাল, ভাষা, ধর্মভেদে ঐতিহ্য সংস্কৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মূলত গ্রামীণ মানুষের আচার—আচরণ, বিশ্বাস, মনন—রুচি, ধ্যান—ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বৈচিত্রমণ্ডিত। লোকসংস্কৃতির মাধ্যমেই অতীতকালের মানুষের সুখ—দুঃখ, চিন্তাধারা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগত উপাদান প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে লোক শিল্পের ঐতিহ্য বহু পুরনো, বলা যায় সাম্যবাদী আদিম সমাজ থেকে লোকশিল্পের সূচনা। গুহা গাত্রে চিত্র অংকন ও মাটির পাত্রের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্য একটি বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক ধারা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই ঐতিহ্যের মধ্যে গান, নাচ, নাটক, শিল্পকর্ম, পোশাক, রীতিনীতি এবং লোককথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পালাগান, ভাটিয়ালি, জারি—সারি, গম্ভীরা ও বাউল গান গ্রামীণ বাংলার মানুষের জীবন ও ভাবনার প্রতিচ্ছবি। এছাড়া, মৃৎশিল্প, নকশিকাঁথা এবং পাটের তৈরি হস্তশিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ। পহেলা বৈশাখ, নববর্ষ, নবান্ন ও চাষাবাদের উৎসবগুলো লোক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব রীতিনীতিও এই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে বা অনুশীলনের মাধ্যমে চলে আসছে। লোক ঐতিহ্য আমাদের পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল।

বাঁশ হলো ঘাস জাতীয় বৃহৎ উদ্ভিদ। বাসা—বাড়ির কাজে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে একে ‘গরিবের দারুবৃক্ষ’ বলা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে বাঁশকে বলা হয় মিরাকল প্লান্ট। বাঙালির জীবনে বাঁশ বহুবিধ কাজে লাগে। বাঁশের কুটিরশিল্প ঘরের শোভা। সুতা এবং কাগজ তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার অনেক আগে থেকে। বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিদেশে রপ্তানি হয়। বাঁশ শিল্প একটি লোকশিল্প। সাধারণত গ্রামের লোকেরা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত এবং বেশির ভাগ তারাই এসব ব্যবহার করে। বাঁশের ব্যবহার বিবিধ। ঘর, মাচা, মই, মাদুর, ঝুড়ি, ফাঁদ, হস্তশিল্প ইত্যাদি ছাড়াও মৃতদেহ সৎকার ও দাফনের কাজেও বাঁশ ব্যবহূত হয়। নিত্য ব্যবহার্য এই বাঁশ কালক্রমে লোকসংস্কৃতি ও কারুশিল্পের প্রধান উপকরণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের যে কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে, বাঁশ তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের লোকজীবনের খুব কম দিকই আছে যেখানে বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী ব্যবহূত হয় না। বাঁশের তৈরি এই শিল্প দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও ক্ষুদ্র ও নৃ—গোষ্ঠীদের জীবনাচরণ ও অনুভূতির প্রতীক।
মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার উত্তর শ্রীবাড়ির ঋষিপাড়া গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষেরাই তাদের বংশপরম্পরায় বাঁশের তৈরী বিভিন্ন প্রয়োজনিয় উপকরণ তৈরী করে আসছে। এসব উপকরণ তারা মুলী বাঁশ দিয়ে তৈরী করে। উপকরন তৈরীর জন্য নির্দিষ্ট মাপে বাঁশ প্রথমে কেটে নিতে হয়। এরপর সেই কাটা অংশ থেকে চটা তৈরী করা হয়। আর বাশের লম্বা অংশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বেতি প্রস্তুত করা হয়। সাধারণত পাঁচ ধরনের বাঁশের বেতি হয়। পল্লা ধরার বেতি, জরিনা বেতি, ভাঙা বেতি, বুনন বেতি ও মাথার বেতি। চটা ও বেতির সাহায্যে একটি উপকরণ তৈরী হয়। বিভিন্ন ধরনের বাঁশের বেতি উপকরনের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত।

ঘিওর ঋষিপাড়ার একজন তরুণ বাঁশ শিল্পের উদ্যোক্তা রতন সরকার। রাস্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাশ করে পূর্ব পুরূষের পেশায় একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। তার অধিনে ঋষিপাড়ার অনেকেই তৈরী করছেন বাঁশের বিভিন্ন উপকরণ। আজ তার অধিনে বাঁশের ঝুড়ি তৈরী করছেন বিভিন্ন কারিগরেরা। কেউ বাঁশ কাটছেন কেউ চটা তৈরী করছেন, কেউবা তৈরী করছেন বেতি আবার কেউ দক্ষ হাতে বুনছেন নির্দিষ্ট ডিজাইনের সেই ঝুড়ি। এদের মধ্যে একজন অনিতা বাবার বাড়িতে ছোটবেলায় এই কাজে হাতেখরি এরপব স্বামীর বাড়িতেও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত তিনি।

বিনোদিনি রাণী স্বামীর বাড়িতে এসে বাঁশের কাজ শিখেছেন এখন পুরোপুরি এ পেশার সাথে আছেন। নিলু রাণী করছেন বেতি তোলার কাজ। ছোট বেলায় বাবার মাধ্যমে কাজ শিখেছেন তিনি।
সঞ্জীব সরকার ছোটকাল থেকেই বাঁশ শিল্পের কাজ করেন। বংশপরম্পবায় এই কাজ শিখেছেন এখনও নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বর্তমানে বাঁশের পণ্যের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে যার কারণ হিসেবে প্লাস্টিক শিল্পকে দায়ী করলেন তিনি।
দিলীপ সরকার বাঁশ শিল্পের একজন দক্ষ কারিগড় জানালেন এ শিল্পের বর্তমান সমস্যার কথা এবং এই শিল্পটিকে ধরে রাখার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
রতন সরকার বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্ডার সংগ্রহ করে কারিগড়ের মাধ্যমে পণ্য প্রস্তুত করেন। এ পেশায় তিনি নিজেও একজন দক্ষ কারিগড়। তার এই ঝুড়ি বিদেশে রপ্তানি হবে বলে তিনি জানেন। কিন্তু এই কাজের প্রয়োজনীয় ন্যায্য মূল্য থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই নতুন প্রজম্য অন্য পেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাঁশের তৈরি শিল্পকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও লোকজীবনে ব্যবহারের বহুমাত্রিকতা ও প্রয়োজনের কারণে এই শিল্পকর্ম বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
সাক্ষৎকার আবুল কালাম আজাদ সেন্টু লোক শিল্পের একজন শুভাকাঙ্খি।
বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, চালুন, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, ঢোল, গোলা, ওড়া, বাউনি, ঝুঁড়ি, ডুলা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, মাথাল, পাখা, বইপত্র রাখার র্্যকসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র, বাঁশের ঘর, বেড়া, ঝাপ, বেলকি, দরমা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প—সংস্কৃতির প্রতীক। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি পাত্রসমূহ খুবই আকর্ষণীয়। এসব পাত্র বা ঝুড়িতে বুননের মাধ্যমে নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।

লোকশিল্প টিকে আছে মূলত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সমাজ এবং সময়ের যে পরিবর্তন এই পরিবর্তনের সাথে সাথে লোকশিল্পীরাও তাদের যে শিকড় তাকে আঁকড়ে ধরে রেখে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নিজেদের নবায়ন করছে। কিন্তু বাঁশ শিল্প আমাদের এই অতিপ্রাচীন ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। অতি মাত্রায় বিষাক্ত প্লাস্টিক পন্যেও ব্যবহার প্রাকৃতিক পরিবেশ বান্ধব বাঁশের তৈরী সামগ্রীর ব্যবহারকে হ্রাস করে দিয়েছে। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে কারিগর উদ্যোক্তাদের ব্যবসাও আজ হুমকীর মুখে। তাই এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই ঐতিহ্য আমাদের গর্ব এবং এটি সংরক্ষণে আমাদের সকলের সচেতন হওয়া জরুরি

Facebook
WhatsApp
X
Telegram

মন্তব্য করুন