প্রবাস—এক জীবনের নাম, এক নিঃশব্দ ত্যাগের গল্প

মানুষ জীবিকার সন্ধানে, উন্নত বাসস্থান, সুন্দর পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সুখের আশায় দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি জমায়। উত্তম জীবনের স্বপ্নে ঘর ছাড়ে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে দেয়, ত্যাগ করে প্রিয় মাতৃভূমির মায়া। আর এভাবেই একজন মানুষ হয়ে ওঠে প্রবাসী

নিজ মাতৃভাষার বাইরে অন্য ভাষাভাষী মানুষের ভিড়ে, ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে প্রথম দিকে মনে হয়—এ যেন এক অচেনা পৃথিবী। নিজেকে মানিয়ে নিতে মানিয়ে নিতে কেটে যায় মাসের পর মাস। মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ, অলস বিকেলে বন্ধুদের আড্ডা—সবকিছু মনে করিয়ে দেয় প্রবাসের কঠোর নিয়ম-কানুন আর যান্ত্রিক জীবনযাপন।

কাজ আর বাসার ফাঁকে ফোনবুকের পরিচিত নম্বরগুলোতে কল দিতে দিতে কেটে যায় দুপুর-রাত। বৈকালিক সময়ে পার্কে হাঁটার পথে মনে হয়—এ যেন এক অচিনপুরী। ধুলা-মাখা গ্রামের পথে বাতাসের গন্ধে ছুটে বেড়ানো দিনের কথা মনে পড়ে। এই মসৃণ রাস্তায় নেই কোনো পরিচিত সুবাস। অজান্তেই চোখের কোণে জমে ওঠে জল—মনে পড়ে যায়, আমি তো একজন প্রবাসী

মাস পেরিয়ে বছর যায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় প্রবাসীরা বঞ্চিত হয় ঈদ, পূজা-পার্বণে প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুখ থেকে। পরিবারের যে ছেলেটা একসময় ছিল বখাটে, প্রবাসে এসে সেও হয়ে ওঠে নিয়মতান্ত্রিক। যে ছেলেটা কখনো নিজের কাপড় গুছায়নি, সে আজ রান্না করে, ঘর পরিষ্কার রাখে, সময়মতো কাজে যায় আর মাস শেষে উপার্জনের টাকা পাঠায় পরিবারের কাছে।

এইভাবেই প্রবাসীরা শুধু পরিবার নয়—অবদান রাখে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও।

কিন্তু আজকাল প্রায়ই শোনা যায়, অল্প বয়সেই স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছেন অনেক প্রবাসী। দূর পরবাসে প্রিয়জনকে পাশে না পাওয়ার বেদনা, তার ওপর পরিবারের বাড়তি প্রত্যাশার চাপ—সব মিলিয়ে প্রবাস মানে নিজের চাহিদা ভুলে যাওয়া। নিজে যত কষ্টেই থাকুক, ফোনের ওপাশে শুধু সুখটাই দেখানোর নামই প্রবাস।

প্রবাস নিয়ে গল্প হয়, উপন্যাস হয়, সিনেমা হয়—কিন্তু প্রবাসীর ভাগ্য বদলায় না। কারণ প্রবাস জীবন জেলের মতো—চাইলেই দেশে ফেরা যায় না। প্রবাসীরা পেয়েছে শুধু “রেমিটেন্স যোদ্ধা”র খেতাব। এটুকুই তাদের গর্ব, এটুকুই অহংকার।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—
প্রবাস কি সত্যিই সুখের?

আমি একজন প্রবাসী—আমার প্রশ্ন এটা।

২০২০ সালে ১৫ বছর চাকরির পর ব্যবসা শুরু করি। ২০২১ সালে করোনার কারণে ব্যবসায় বড় ক্ষতির মুখে পড়ি। ঋণের বোঝা চেপে বসে। অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি মিলছিল না। অনেক কষ্টে দিন কাটতে থাকে। একসময় মনে হয়েছিল—এই জীবন আর রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তাভাবনা বদলাই।

আলহামদুলিল্লাহ—আজ আমি সৌদি আরবে আছি, ভালো আছি। আর এই ভালো থাকার পেছনে বড় অবদান আমার চাচাতো ভাইয়ের।

শেষ কথা

দেশ ছাড়ার আগে দেশের প্রতি যত ক্ষোভই থাকুক, বিমানে উঠতেই হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে যায়। প্রিয় মানুষগুলোর মলিন মুখ বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্মৃতিবিজড়িত সময়গুলো হু হু করে নেড়ে দেয় জমে থাকা কান্না।

এইভাবেই শুরু হয়
একজন প্রবাসীর জীবনের আর্তনাদ।

একজন প্রবাসীর অনুভব

 

Facebook
WhatsApp
X
Telegram

মন্তব্য করুন