
নানা আয়োজন ও গভীর শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। ভাষাশহীদদের স্মরণে দিনভর মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে, সাদা-কালো পোশাকে, হাতে ফুল নিয়ে ভাষার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
শনিবার প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয় এবং সেহরি পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। পরে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে প্রভাতফেরিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ও রাজনৈতিক সংগঠন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। শ্রদ্ধার ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতির মিনার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাত ১২টা ৮ মিনিটে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর পর বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ডা. শফিকুর রহমান-এর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় জোট শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।
তিন বাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন তিন বাহিনীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এছাড়া বিজিবি, বাংলাদেশ পুলিশ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, সিপিবি, বাসদ, জাসদ, জেএসডি, এনডিএম, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন দল অংশ নেয়। ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
একুশের চেতনায় অঙ্গীকার
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ঢাবি উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনের চেতনায় জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতাকে প্রতিহত করেই একুশের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রাণচাঞ্চল্য
দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করে। নজরুল মঞ্চে কবিতা পাঠ, অমর একুশে বক্তৃতা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ছায়ানট ভাষাশহীদদের স্মরণে গান-কবিতা ও কথনভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী প্রভাতফেরি ও আলোচনা-সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একুশের শিক্ষা
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক অভিভাবক সন্তানদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শোনান। বিদেশি নাগরিকরাও শ্রদ্ধা জানাতে এসে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের বিরল ইতিহাসে মুগ্ধতার কথা জানান।
একুশ যেন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। ভাষার মর্যাদা, গণতন্ত্র, সমঅধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যয়ই উচ্চারিত হয়েছে দিনভর নানা আয়োজনে।
মহান একুশ তাই শুধু শোকের নয়, শক্তি ও প্রেরণারও নাম।











